Grab4Learn v2.1 is now available on Android
Min: android 4.4+ | Max: android 11
Download

আপেক্ষিকতা কি এবং সময়ের আপেক্ষিকতার মাথামুণ্ডু- পর্ব ১

Please wait 0 seconds...
Scroll Down and click on Go to Link
Congrats! Link has Generated
আপেক্ষিকতা কি এবং সময়ের আপেক্ষিকতা

আপেক্ষিকতা (Relativity) কি?

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও ইন্টারেস্টিং টপিক হলো 'আপেক্ষিকতা' বা Relativity। স্থান ও কাল - এই দুটি বিষয় নিয়েই আপেক্ষিকতা আলোচনা বেশি হয়। মহাকাশ সম্পর্কিত  অজানা বিষয়গুলোকে সহজে বুঝতে হলে আপেক্ষিকতা সম্পর্কে স্বচ্ছ একটি ধারণা থাকা প্রয়োজন। এজন্য যারা আপেক্ষিকতা সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না অথবা যাদের অল্প-স্বল্প ধারণা আছে তারাও মগজকে ঝালিয়ে নিন। আপেক্ষিকতা- বিষয়টি একটু জটিল প্রকৃতির। অনেক গাণিতিক বিষয়াবলী জড়িয়ে আছে এর ভিতরে। সহজ করে বুঝানোর জন্য এখানে শুধু তাত্ত্বিক বিষয় সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। সর্বপ্রথম আপেক্ষিকতা সম্পর্কে ধারণা দেন মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন

"এ মহাবিশ্বের সব কিছুই আপেক্ষিক। স্থান, কাল সহ আমরা চারদিকে যা দেখি সব কিছুই আপেক্ষিক।" --আইনস্টাইন

আপেক্ষিকতা বিষয়টি এতই বিস্তৃত যে, এটা নিয়ে ধারাবাহিক পোস্ট করলেও অল্প কয়টি পোষ্টে শেষ করা যাবে না। এজন্য আমরা শুধু এখানে সময়ের আপেক্ষিতা নিয়ে আলোচনা করবো। এটি বুঝে গেলে পরবর্তীতে ব্ল্যাকহোল নিয়ে আলোচনা করলে তখন আর বুঝতে সমস্যা হবে না।

সময়ের আপেক্ষিকতা (Relativity of time): 

আইন্সটাইন এর মতে, মহাবিশ্বের সকল স্থানের সময়ের পার্থক্য সমান নয়। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার মত সময়ও একটি মাত্রা। সময় এর হিসাব প্রতিটি পর্যবেক্ষণকারীর কাছে  আলাদা আলাদা হবে। একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক। 

মনে করুন, আপনি একটা দশ তলা বিল্ডিং এর নিচ তলায় থাকেন এবং আপনার বন্ধু একই বিল্ডিং এর দশম তলায় থাকে। আপনাদের দুজনের কাছে রয়েছে একটি করে ঘড়ি। কিন্তু সমস্যা হলো আপনাদের দুজনের ঘড়ি একই গতিতে চলবে না। অর্থাৎ, আপনার বন্ধু, যিনি দশম তলায় থাকেন তার ঘড়ির চাইতে আপনার ঘড়ি কিছুটা ধীরে চলবে! 

যদিও এখানে সময়ের পার্থক্য এতই নগণ্য যে যা বোঝা যায় না। সেটি হতে পারে ন্যানোসেকেন্ডের কিংবা তারও কয়েক কোটিভাগের এক ভাগ মাত্র! ভূ পৃষ্ঠ থেকে যতই উপরে উঠবেন ততই দেখবেন আপনার ঘড়ি ভূপৃষ্ঠে থাকা যেকোন ঘড়ির চাইতে দ্রুত চলবে! ইন্টারেস্টিং না ব্যাপারটা? একেই বলে কাল দীর্ঘায়ন (Time Dilation) বা সময়ের আপেক্ষিতা- যা আপেক্ষিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

আরো পড়ুনঃ 

আপেক্ষিতার ইতিহাস (History of Relativity):

অ্যারিস্টটল মনে করতেন, স্থান ও কাল দুটিই পরম। কোনো ঘটনা কখন এবং কোথায় ঘটেছে সে সম্পর্কে সকল পর্যবেক্ষক একমত হবেন। কিন্তু নিউটন দাদু এসে পরম স্থানের সকল ধারণাকে বিদায় জানিয়ে দেন। আইনস্টাইন দাদুও বিদায় জানান পরম সময়কে। তবে পরম সময়ের কফিনে মাত্র একটিমাত্র পেরেক ঠুকে তাঁর মন ভরেনি। ১৯০৫ সালে যখন তিনি তাঁর বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব (Theory of Relativity) প্রকাশ করেন তখন বলেছিলেন, আলোর কাছাকাছি বেগে গতিশীল কোনো বস্তুর সময় চলবে তুলনামূলক অনেক ধীরে। এখানে একই সময়ে ভূপৃষ্ঠে থাকা অপর বস্তুর সাথে তুলনা করা হয়েছে। তারপর ১৯১৫ সালের প্রকাশ করেন  আরেক যুগান্তকারী তত্ত্ব। এটি হলো মহাকর্ষের সর্বাধুনিক তত্ত্ব সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General theory of relativity) নামে পরিচিত। সেখানে দেখালেন, কাল দীর্ঘায়ন ঘটায় মহাকর্ষও। 

অবশ্য অতি উচ্চ গতির মতো মহাকর্ষও যে কাল দীর্ঘায়ন ঘটাতে পারে তা আইনস্টাইন ১৯০৭ সালে লেখা ও ১৯০৮ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো তাঁর এই অনুমান ১০০ বছর পর অর্থাৎ এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রমাণিত হয়েছে। 

স্থানের আপেক্ষিকতার এক্সপেরিমেন্ট
স্থান-কালের আপেক্ষিতার এক্সপেরিমেন্ট

আপেক্ষিকতার মৌলিক নীতি (Fundamental Law of relativity):

দুটি আপেক্ষিক তত্ত্বেই একটি করে মৌলিক নীতি মেনে চলা হয়। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে তা হলো 'আপেক্ষিকতার মৌলিক স্বীকার্য '। এই ধারণাটি হলো- মুক্তভাবে গতিশীল সকল পর্যবেক্ষকের কাছে পদার্থবিজ্ঞানের সকল সূত্র একই থাকবে, বেগ যাই হোক না কেন তাতে কিছু যায় আসে না। উল্লেখ্য, এখানে ত্বরণ সম্পর্কে কিছু বলা হয় নি।

আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের মৌলিক নীতিটি হল, সমতুল্যতার নীতি (Principle of equivalence)। এই নীতির ধারণা হল- বেশ ক্ষুদ্র স্থানের অঞ্চলে অবস্থান করে এটা বলা সম্ভব নয় যে আপনি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থিরাবস্থায় আছেন, নাকি শূন্য স্থানে সুষম হারের ত্বরণ (বেগ বৃদ্ধি) গতিশীল আছেন।  এই গুরুগম্ভীর কথা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে তাই তো? চলুন একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া যাক।

মনে করুন, আপনি মহাশূন্যে এমন একটি লিফটে আছেন, যেখান মহাকর্ষ বল নেই। যার জন্য এখানে উপর-নিচ বলতে কিছুই নেই। আপনি মুক্তভাবে ভেসে বেড়াচ্ছেন। আপনার মনে হচ্ছে আপনার কোন ওজনই নেই। ভরহীন! কিন্তু একটু পর লিফট সমত্বরণ নিয়ে চলা শুরু করল। এখন হঠাৎ করে আপনি একটু ওজন অনুভব করবেন। স্থিতি জড়তার জন্য লিফটের গতির বিপরীত দিকের প্রান্তে আপনি একটি টান অনুভব করবেন। এই প্রান্তটিই তখন আপনার কাছে মেঝে মনে হবে! আপনি এখন হাত থেকে একটি আপেল ছেড়ে দিলে এটি উক্ত 'মেঝে'র দিকে চলে যাবে।

আসলে এখন আপনার মতোই লিফটের ভেতরের সব কিছুরই মূলত ত্বরণ হচ্ছে। মনে হচ্ছে লিফটটা মোটেই গতিশীল নয়, বরং এটি একটি সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থির অবস্থায় আছে। ট্রেনের ভেতরে বসে যেমন আপনি বলতে পারবেন না যে আপনি সমবেগে গতিশীল কি না, তেমনিভাবে লিফটের ভেতরে বসেও আপনি বুঝতে পারবেন না আসলে আপনি  সুষমত্বরণে গতিশীল, নাকি কোনো সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মধ্যে আছেন। আইনস্টাইনের এই চিন্তার ফলাফলই হল সমতুল্যতার নীতি

সমতুল্যতা নীতি (Principle of Equivalence):

সমতুল্যতার নীতি এবং এই উদাহরণটি সত্য হলে বস্তুর জড় ভর (Inertial mass)মহাকর্ষীয় ভরকে (Gravitational mass) অবশ্যই একই জিনিস হতে হবে। বল প্রয়োগের ফলে বস্তুর কতটুকু ত্বরণ হবে তা নির্ভর করে জড় ভরের ওপর। নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্রে এই ভর নিয়েই কথাই বলা হয়েছে। আর অন্য দিকে নিউটনের মহাকর্ষীয় সূত্রে বলা আছে মহাকর্ষীয় ভরের কথা। আপনি কতটুকু মহাকর্ষীয় বল অনুভব করবেন তা নির্ভর করবে এই মহাকর্ষীয় ভরের ওপর।

সমতুল্যতা নীতির প্রয়োগ

আমরা সমতুল্যতার নীতি সম্পর্কে তো জানলাম। কিন্তু আইনস্টাইনের যুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এবার একটি থট এক্সপেরিমেন্ট (Thought Experiment - যে পরীক্ষা বাস্তবে করা যায় না, চিন্তা করে করে বুঝতে হয়) করতে হবে। এটি আমাদেরকে দেখাবে মহাকর্ষ সময়কে কীভাবে প্রভাবিত করে।

মহাশূন্যে অবস্থিত কোন একটি রকেটের কথা চিন্তা করুন যেটি মুক্তভাবে ভাসমান রয়েছে। চিন্তার সুবিধার জন্যে ভাবুন যে রকেটটি এতই বড় যে এর মাথা থেকে তলায় আলো পৌঁছতে এক সেকেন্ড লাগে। অর্থাৎ রকেটটির দৈর্ঘ্য ১, ৮৬,০০০ মাইল বা প্রায় ৩ লক্ষ কি.মি.। আবার মনে করুন রকেটের মাথায় ও মেঝেতে একজন করে দর্শক আছেন। দুজনের কাছেই একই রকম একটি করে ঘড়ি আছে যা প্রতি সেকেন্ডে একটি করে টিক দেয়।

এবার মনে করা যাক, রকেটের মাথা অর্থাৎ সিলিং এর দর্শক ঘড়ির টিকের অপেক্ষায় আছেন। টিক পাওয়ার সাথে সাথেই তিনি মেঝের দর্শকের দিকে একটি আলোক সঙ্কেত পাঠালেন। পরে ঘড়িটি আবারও টিক (সেকেন্ডের কাঁটায়) দিলে তিনি আরেকটি আলোকসংকেত পাঠালেন। তার মানে প্রতিটি সংকেত এক সেকেন্ড পর মেঝের দর্শকের কাছে যাচ্ছে। সিলিংয়ের দর্শক যদি এক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি সঙ্কেত পাঠান তবে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি  সংকেত পাবেন।

কিন্তু মুক্তভাবে ভেসে না থেকে রকেট যদি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টানের মধ্যে থাকে তাহলে কী হবে? 

নিউটনের থিওরী আনুযায়ী, এই ঘটনায় মহাকর্ষের কোনো হাত নেই। সিলিং এর দর্শক এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সংকেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের মধ্যেই  পাবেন। কিন্তু সমস্যা হলো সমতুল্যতার নীতি ভিন্ন কথা বলে। চলুন দেখা যাক, নীতিটি কাজে লাগিয়ে আমরা মহাকর্ষের বদলে সুষম ত্বরণ নিয়ে চিন্তা করে কী পাচ্ছি। মহাকর্ষ থিওরি তৈরি করতে আইনস্টাইন সমতুল্যতার নীতি যেভাবে কাজে লাগিয়েছেন এটি হলো তার একটি উদাহরণ। 

গতিশীল রকেটে সমতুল্যতা নীতি

এবার তাহলে মনে করুন রকেটটি একটি ক্ষুদ্র ত্বরণ নিয়ে চলছে অর্থাৎ প্রতি মুহূর্তে এর বেগ বেড়ে যাচ্ছে। রকেটটি উপরের দিকে গতিশীল হওয়ায় প্রথম সংকেতটিকে আগের চেয়ে (যখন রকেট স্থির ছিল তখন সিলিং থেকে আসা আলোকসংকেত) কম দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে। কাজেই সংকেতটি এখন এক সেকেন্ড পার হবার আগেই তলায় পোঁছে যাবে। রকেটটি যদি নির্দিষ্ট বেগ নিয়ে (ত্বরণহীন) চলতো, তাহলে সকল সংকেত এক সেকেন্ড পরপরই পোঁছাতো। কিন্তু এখানে ত্বরণ আছে বলে প্রথমে যখন সংকেত পাঠানো হয়েছিল, রকেট এখন তার চেয়ে দ্রুত চলছে। কাজেই দ্বিতীয় সংকেত আরও কম দূরত্ব পার হতে হবে। ফলে এটি পোঁছাতেও আরও কম সময় লাগবে।

মনে রাখতে হবে যে বেগ এবং ত্বরণ - দুটি এক নয়। বেগ হলো সময়ের সাথে অবস্থান পরিবর্তনের হার। আর ত্বরণ হলো সময়ের সাথে বেগ পরিবর্তনের হার।

আরো পড়ুনঃ 

কাজেই মেঝের দর্শক দুটি সংকেতের মাঝে সময় ব্যবধান পাবেন এক সেকেন্ডের চেয়ে কম। যদিও সিলিং এর দর্শক ঐ সংকেত পাঠিয়েছেন ঠিক এক সেকেন্ড পরে। ব্যস্, হয়ে গেল সময়ের গরমিল! ত্বরণপ্রাপ্ত রকেটের ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই অদ্ভুত লাগার কথা নয়।

কিন্তু অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, সমতুল্যতার নীতি বলছে, রকেট যদি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রেও স্থির থাকে তবুও একই ঘটনা ঘটবে। অর্থাৎ, সিলিং এর দর্শক এক সেকেন্ড পর দুটো সংকেত পাঠালে মেঝের দর্শক তা পাবেন এক সেকেন্ডের আগেই। এবার অদ্ভুত লাগছে, তাই না?

এখন অবশ্য প্রশ্ন আসতে পারে মাথায় তাহলে এর অর্থ কী দাঁড়াচ্ছে? মহাকর্ষ  সময়কে বিকৃত করছে নাকি ঘড়িকে অচল করে দিচ্ছে?

বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব আমাদের বলছে, ভিন্ন বেগে চলা দর্শকের জন্যে সময় ভিন্ন গতিতে চলবে। আর সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব বলছে, একই মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের গতি আলাদা। 

সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে, মেঝের দর্শক এক সেকেন্ডের চেয়ে কম সময় পেয়েছেন, কারণ পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছে সময় অপেক্ষাকৃত ধীরে চলছে। মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র শক্তিশালী হলে এই প্রভাবও হবে বেশি। একদিকে নিউটনের গতি সূত্রের মাধ্যমে বিদায় নিয়েছিল পরম স্থানের ধারণা, আবার অন্যদিকে আইনস্টাইনে আপেক্ষিক তত্ত্বও বিদায় দিলো পরম সময়ের ধারণাকে

কাল দীর্ঘায়নের এক্সপেরিমেন্টস (Experiments of time dilation):

১৯৬২ সালে কাল-দীর্ঘায়ন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। একটি টাওয়ারের উপরে ও নিচে দুটি অতি সূক্ষ্ম ঘড়ি বসানো হয়। দেখা গেল নিচের ঘড়িটিতে (যেটি পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছে আছে) সময় ধীরে চলছে, ঠিক সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব যা অনুমান করেছিল তেমনই। এই প্রভাব অনেক ক্ষুদ্র। 

সূর্যের পৃষ্ঠে রাখা কোনো ঘড়িও পৃথিবীর পৃষ্ঠের তুলনায় প্রায় এক মিনিট সময় পার্থক্য দেখাবে। 

পাহাড়ে সময়ের আপেক্ষিকতা
পাহাড়ে সময়ের আপেক্ষিকতা

কাল দীর্ঘায়নের প্রভাব (Effects of time dilation):

পৃথিবীর ওপরের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের এই ক্ষুদ্র পার্থক্যগুলিই বর্তমানে বাস্তব ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

স্যাটেলাইট থেকে আসা সঙ্কেতের মাধ্যমে আমাদের নেভিগেশন সিস্টেমকে ঠিক রাখার জন্যে এর প্রয়োজন হয়। এই প্রভাব উপেক্ষা করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অবস্থান বের করলে তা ভূল দেখাবে!

কাল-দীর্ঘায়নের পার্থক্য ধরা পড়ে আমাদের শরীরেও। একটি বিখ্যাত উদাহরণ দেয়া যাক। 

এমন এক জোড়া যমজের কথা কল্পনা করুন, যাদের একজন বাস করে পাহাড়ের চূড়ায় এবং আরেকজন থাকে সমুদ্র সমতলে। প্রথম ব্যক্তির বয়স ২য় জনের চেয়ে দ্রুত বাড়বে। দুজনে দেখা করলে দেখা যাবে যে একজনের বয়স আরেকজনের চেয়ে বেশি। এই ক্ষেত্রে বয়সের পার্থক্য খুবই কম হবে। তবে এদের কেউ একজন যদি আলোর কাছাকাছি গতিতে মহাকাশযানে করে ভ্রমণ করে ফিরে আসে তাহলে দেখা যাবে বাকি যমজের চেয়ে তুলনায় তার বয়স অনেক কম হচ্ছে। 

এই সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমরা পরবর্তীতে গাণিতিক প্রমাণ অংশে দেখবো। 

আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বে পৃথিবী থেকে দূরে গিয়ে অনেক বেশি বেগে (আলোর বেগের কাছাকাছি) ভ্রমণ করে এলে আপনার বয়স অপেক্ষাকৃত কম হবে। আর আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বে আপনি পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে দূরে অবস্থান করলে বয়স দ্রুত বাড়বে। এখানে একটি প্রভাব আপাতদৃষ্টিতে আরেকটি থেকে ঠিক উল্টোভাবে কাজ করে। অবশ্য আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব কার্যকর হওয়ার জন্যে আপনাকে রকেটে চড়ে মহাশূন্যেই যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আপনি যদি পৃথিবীতেই একটি অতি দ্রুতগামী ট্রেনে (কখনো সম্ভব কিনা জানিনা) চড়ে ভ্রমণ করেন তাহলেও ট্রেনের বাইরে থাকা আপনার বন্ধুর চেয়ে আপনার বয়স কম হবে।

এ ফলাফলগুলো পাওয়া যায় আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বে। এ তত্ত্বের সমীকরণগুলো অতিমাত্রায় জটিল ও সাধারণের জন্যে দূর্বোধ্যও বটে। তবে, কাল দীর্ঘায়নের সমীকরণ তার তুলনায় অনেক বোধগম্য ও সরল। বেগ জনিত কাল দীর্ঘায়নের সূত্রের সাথেও এর বেশ মিল আছে।

সময় আপেক্ষিকতার সূত্র
সময় আপেক্ষিকতার সূত্র


আরো পড়ুনঃ 

আপেক্ষিকতার সাধারন সূত্র থেকে বের হয় সোয়ার্জসাইল্ড সমাধান থেকে। এটিই ব্ল্যাক হোলের সমীকরণ। সূত্র থেকে সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধের মান পাওয়া যায় যা কোনো ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তকে নির্দেশ করে। 

অজ্ঞাত ভরের একটি বস্তুর সবটুকু ভর এই ব্যাসার্ধের ভেতরে অবস্থান করলে বস্তুটির মহাকর্ষীয় বল এতই শক্তিশালী হবে যে, এর থেকে কোনো কিছুই বেরিয়ে আসতে পারবে না এমনকি আলোও না।

সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধের সূত্রটি হলোঃ

সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধের সূত্র
সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধের সূত্র

এখানে rs-ই হলো সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধ (Schwarzschild radius) 

ব্ল্যাক হোলের সীমানায় পৌঁছে সূত্রটি প্রয়োগ করলে to এর মান হয়ে যাবে শূন্য। এর মানে হলো বাইরের কোনো দর্শকের কাছে মনে হবে এখানে সময় থেমে আছে। যার জন্য ব্ল্যাক হোলের সীমানা পেরিয়ে কোনো কিছুকেই কখনো ভেতরে যেতে দেখা যাবে না

ব্ল্যাকহোলের ভেতর পড়ে গেলে কি হবে?

তবে ব্ল্যাকহোলের পড়েই গেলে ব্যাপারটা হয়ে পড়ে আরও অদ্ভুত। এক্ষেত্রে বর্গমূলের ভেতরের রাশিটা হবে ঋণাত্মক। মানে, ফল হিসেবে পাওয়া যাবে কাল্পনিক সময়, যার ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত জানা নেই। অবশ্য বাইরে থেকে ভেতরের কিছুই দেখা যাবে না। 

ব্লাকহোলের গ্রাভিটি এত পরিমান বেশি যে সেখানে কাটানো কয়েক মিনিটে হয়ত পৃথিবীর ৫০০ কোটি বছর কেটে যাবে!

আপনি যতই দ্রুত চলবেন, আপনার কাছে থাকা ঘড়ি, পৃথিবীতে থাকা অন্য একটি ঘড়ির তুলনায় পিছিয়ে পড়বে। যদিও মানুষের পক্ষে যদি আলোর বেগে চলাচল করা অসম্ভব। 

কেননা আলোর বেগে গতিশীল বস্তুর ভর অসীম হয়ে যায়। কিন্তু যদি এই বেগে গতিশীল হওয়া যেত তাহলে পৃথিবীবাসির কাছে মানে হবে আপনার ঘড়ি একেবারে থেমে গেছে! এতটাই ধীর হয়ে যাবে আপনার ঘড়ি, যে আপনার কাছে তা কিছুই মনে হবে না, কারন আপনি আছেন আপনার দৃষ্টিভঙ্গিতে (Perspective)।

পরবর্তীতে আমরা জানবো ব্ল্যাকহোল নিয়ে। ব্ল্যাকহোলে সময়ের আচরন কেমন ঘটে, ব্ল্যাকহোল কি এবং নিয়ে বিস্তারিত।

©তথ্যসূত্রঃ ব্যাপন, বিজ্ঞানচিন্তা, উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য

অনুগ্রহপূর্বক আপনার অনুভূতি এবং কোন কিছু জানার থাকলে কিংবা কোন কোন টপিকের উপর লিখা পেতে চান, সেগুলি কমেন্ট করে জানাবেন।

আরো দেখুনঃ 

Post a Comment

Write you valuable comments...
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
Grab4LearnIf you have any query, send us... (WhatsApp)
Hello, How can we help you?
Start chat...